সন্তান জন্মদান ও আমাদের বাবা-মা হয়ে ওঠা

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry

সন্তান জন্মদান ও আমাদের বাবা-মা হয়ে ওঠা

সন্তান জন্মদানের সাথে সাথে আমরা বাবা-মা হিসেবে নতুন করে জন্মলাভ করি। বাবা-মা হওয়া অনেকটাই সোজা কিন্তু একজন দক্ষ ও সচেতন বাবা-মা হয়ে বিচক্ষণতার সাথে সঠিকভাবে সন্তানকে সামলানো ও লালন-পালন করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ সন্তানের মানসিক, শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশগুলো গড়ে ওঠে মূলত পরিবার থেকেই, বাবা-মায়ের কাছ থেকে। সন্তানের সঠিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করার জন্য ও প্যারেন্টিং  দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কিছু সচেতন প্রচেষ্টা এবং কাজ সব বাবা-মায়ের করা প্রয়োজন। আপনিও আপনার প্যারেন্টিং দক্ষতাগুলো বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে পারেন যেভাবে তা নিয়েই আজকে আমাদের এই লেখা।

 

চোখ খোলা রাখুন সবসময়ঃ

আমরা সবসময় প্রচুর কাজের চাপে থাকি। দায়িত্ববোধ ও বিভিন্ন বিষয়ে ব্যস্ততা আমাদের মনোযোগকে নানানদিকে সরিয়ে নেয় প্রতিনিয়ত। তাই অনেকসময় আমাদের সন্তানদের দিকে সম্পূর্ন মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা আর আমরা বুঝতে পারিনা বা খেয়াল করতে পারিনা যে আমাদের সন্তান অস্বস্তিতে রয়েছে, হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে গিয়েছে  বা রেগে যাচ্ছে কিংবা গম্ভীর হয়ে গেছে। অথবা তার মনোভাব বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এই সব ক্ষেত্রে আপনাকে এর কারণ বের করতে হবে এবং যদি আপনার সন্তানের

কোন সমস্যা হয় তবে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধান করতে হবে। এজন্য চোখ খোলা রাখুন সবসময় আপনার সন্তানকে সঠিকভাবে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য।

 

সন্তানের শিক্ষকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুনঃ

অবাক হচ্ছেন? আপনি আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠায় ও সার্বিক বিকাশে যেমন গুরুত্বপূর্ণ  ঠিক তেমনভাবে সন্তানের শিক্ষকও তার একাডেমিক, মানসিক, সামাজিক ও অন্যান্য বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ আপনার পরেই সন্তান তার শিক্ষকের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। সুতরাং বাসায় কোন সমস্যা হলে যদি তা আপনার সন্তানকে প্রভাবিত করে, নিয়মিত আপনার সন্তানের আপডেট জানতে বা জানাতে কিংবা কিভাবে একসাথে আপনাদের ভূমিকা আপনার সন্তানের বিকাশে

কাজে লাগবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সন্তানের শিক্ষকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করুন।

সন্তানকে সামাজিক করে তুলুনঃ

সমাজে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যে নিয়ম-নীতি ও অভ্যাসগুলো শেখা প্রয়োজন তা আপনার সন্তানকে শেখানোর ও তাকে সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আপনার।

কিভাবে আপনার সন্তানকে সোশ্যাল স্কিলস শেখাবেনঃ

১। বাসায় কিছু রুলস তৈরি করুন ও তা মেনে চলা বা না মানার ফলাফল সম্পর্কে আপনার সন্তানকে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেন।

২। খাওয়া, ঘুম, টিভি দেখা ও খেলার জন্য সময় বরাদ্দ করে একটি রুটিন বানিয়ে দিন এবং তা মেনে চলতে শেখান।

৩। অন্যর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখান। এটা সহজ না কিন্তু আপনি যদি তাদের বিচার করতে শেখান একজন মানুষ কখন কী আচরণ করে, কিংবা কেন করছে যেমন- যদি কেউ রাগ করে বা মন খারাপ করে থাকে কিংবা মিসবিয়েভিয়্যারের পেছনের কারণ ইত্যাদি তাহলে আপনার শিশু সহানুভূতিশীল হতে শিখবে, অন্যকে বুঝতে শিখবে।

৪। কিছু বেসিক রুলস নির্ধারণ করার পাশাপাশি তা প্রতিদিনের জীবনে প্রতিনিয়ত মেনে চলা নিশ্চিত করা। যেমন- মারামারি, শব্দ বা শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত করা (no hitting, kicking, biting, spitting, (no hands allowed), and no hurting others through our words) ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষেধ।

সন্তানকে স্বনির্ভর হতে শেখানঃ

আমরা সাধারণত সন্তানকে খুব আহ্লাদ দিয়ে মানুষ করতে চাই, বাসার কোন কাজ করতে দেইনা, নিজেরা তাদের কাজগুলো করে দেই। যদি আপনি আপনার সন্তানকে স্বনির্ভর ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তবে তাকে অতিরিক্ত আহ্লাদ দেওয়া বন্ধ করুন এবং বাসার কাজগুলো করতে শেখান।  শুরুটা করুন আজ থেকেই, অল্প অল্প করে শেখান তার নিজের কাজগুলো করতে এবং আপনাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে।  যখন শিশুরা নতুন কোন কাজ করতে শেখে, নিজেরা করতে পারে তখন  তারা তাদের দক্ষতার ব্যাপারে আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

আমরা যেভাবে আমাদের সন্তানদের স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে পারিঃ

১। বাচ্চাকে তার নিজের কাজগুলো একা একা করতে শেখান, যেমন- জামা-কাপড় পড়া, জুতো পড়া, স্কুলের জন্য টিফিন গুছিয়ে নেওয়া, নিজে হাতে খাবার খাওয়া, অ্যালার্ম দিয়ে সকালে ঠিক সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, এবং নিজেকে গুছিয়ে রাখা।

২। শিশুকে সময়মতো তার খাবার খাওয়া, নিজের পড়া কমপ্লিট করা, হোমওয়ার্ক বা প্রজেক্ট-এর কাজ করা, পাজল সলভ, এগুলো তাকে নিজে নিজে করতে দিন  যখন সে বড় হতে থাকবে। নিজে পাশে বসে করানোর চেয়ে শিশুকে নিজের কাজগুলো করে তা চেক করানোই ভালো যখন এগুলো তাদের কাজ, বাবা-মায়ের নয়।

৩। বাড়ির বিভিন্ন কাজে তাকে যুক্ত করুন । যেমন-  রোদে শুকানো কাপড় তোলা ও ভাজ করা, খাবার পরিবেশনে সাহায্য করা ও খাবার টেবিল গুছিয়ে পরিষ্কার করা, বাড়ি পরিষ্কার  ও গোছানো, টুকটাক রান্না ইত্যাদি। এতে আপনার সন্তান দায়িত্বশীল হতে শিখবে ও আপনার কাজের চাপও কমবে। আপনি যদি ওয়ার্কিং প্যারেন্ট হয়ে থাকেন তবে এসব ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করে আপনার সন্তান আপনার পরিশ্রম, কাজের চাপ ও আপনাকে আরো ভালভাবে বুঝবে। সন্তানের সাথে আপনার সম্পর্ক আরও চমৎকার হবে।

সন্তানের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করুনঃ

আমরা এই বিষয়টা সবচেয়ে অবহেলা করি। সন্তান যেন আপনাকে কখনোই ভয় না পায়। যতই অস্বস্তিকর, অপরাধ বা অন্যায় কাজ করুক না কেন, আপনার সন্তান যেন নিশ্চিন্তে তা আপনার সাথে শেয়ার করতে পারে এই ভাবনা নিয়ে যে আপনি তাকে ঘৃনা করবেন না অথবা দূরে ঠেলে দিবেন না। অনেকক্ষেত্রে কনসিকয়েন্স বা হতাশা হতে পারে কিন্তু সন্তানকে এই অনুভূতি বা আশ্বাস দেওয়া প্রয়োজন যে আপনি সব ভাল-মন্দে তাদের পাশে থাকবেন।

সন্তানের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে যা সাহায্য করবেঃ

১। প্রতিদিন সন্তানের সাথে হাসুন, গল্প করুন, শেয়ার করুন কোন ঘটনা, একসাথে খাবার খান, সময় দিন তাকে যাতে সে বুঝতে পারে যে সে আপনার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।

২। প্রতিদিন তার সাথে কথা বলুন নিয়ম করে তা যতই অল্প সময় হোক না কেন এবং তার সারাদিন কেমন কাটল বা কী হয়েছে আজকে তা জানতে চান। সন্তানের বন্ধু, স্কুল ইত্যাদি সব কিছুর কথা আগ্রহের সাথে শুনুন।

৩। বাসায় ফেরার পর যতটা সম্ভব ল্যাপটপ, ফোন ও অফিসের কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন এবং আপনার সন্তানের সাথে একসাথে বাসার কাজগুলো করুন ও তাকে শেখান।

৪। যে গলার স্বর বা যেভাবে আপনি আপনার সন্তানের কাছে কথা শুনতে চান বা ব্যবহার প্রত্যাশা করেন সেগুলো তার সাথে করুন। আপনার সন্তান আপনাকে দেখেই শিখবে।

৫। আপনার ভালবাসা প্রকাশ করুন আপনার সন্তানের সামনে, দিন যতই খারাপ যাক না কেন।

 

বিচক্ষণ বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানের সাথে যেমন আচরণ করেন তার কিছু নমুনা নিচের ছবিতে পাবেন।

Share your thoughts
Like
Like Love Haha Wow Sad Angry