৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস। প্রতি বছরই সেই উপলক্ষে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানা ধরণের পোস্ট কিংবা স্ট্যাটাস দেখি। প্রায় সব পোস্টেই শিক্ষকগণ কত মহান, তারা আমাদের জাতির কাণ্ডারি,

দেশ গড়ার কারিগর ইত্যাদি কথায় শিক্ষকতা পেশাকে অনেক উঁচু জায়গায় স্থান দেওয়া হয়। এ পেশার এত মহত্ব থাকা সত্ত্বেও, একজন অভিভাবক হিসেবে নিজেদের সন্তানদের কি স্কুল শিক্ষক হতে দিবেন?

জানি অধিকাংশই উত্তর দিবেন ‘না’ এবং এর পিছনে উপযুক্ত কিছু যুক্তিও থাকবে যা প্রমাণ করে যে নিজের সন্তানকে ‘স্কুল শিক্ষক’ বানানোর স্বপ্ন দেখা আসলে বাস্তবিক কোন স্বপ্ন হতে পারে না।

প্রথমত, শিক্ষকদের বেতন কম
দ্বিতীয়্ত, শিক্ষকদের সামাজিক স্ট্যাটাস অন্যান্য পেশার তুলনায় বহু অংশে কম
এবং তৃতীয়ত, শিক্ষকের কোন ক্যারিয়ার প্রোগ্রেস নাই

কোন পেশার জন্য বেতন কত হবে এবং সামাজিক স্ট্যাটাস কেমন হবে সেটি নির্ধারণ করে সেই সমাজ। সমাজের বা দেশের লোকজন যেদিন মনে করবে ‘শিক্ষকতা পেশা’ শ্যাম্পু বেচার পেশার (বিভিন্ন কোম্পানির মার্কেটিং জবের কথা বলছি) চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেদিন আপনাআপনিই বেতন কিংবা স্ট্যাটাস দুই’ই বাড়বে।

সরকার এক দফায় শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়েছে। এই ধারা সামনেও বজায় থাকবে।

ক্যারিয়ার প্রোগ্রেসের কথা যদি বলি, তাহলে ব্যাপারটাকে এইভাবে দেখা যায়না কেন যে – একজন আজকে শিক্ষকতায় ঢুকল কোন এক স্কুলে, তাকে কেন সারাজীবন স্কুলেই থাকতে হবে? সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা আস্তে আস্তে উপরে উঠে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে প্রধান শিক্ষক হন। সেখান থেকে কেন তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসার হতে পারেন না, এরপর জেলা শিক্ষা অফিসার এবং একদিন শিক্ষামন্ত্রী! অনেক দেশেই এরকম ব্যাবস্থা আছে। আমরাও কিন্তু চাইলেই পারি।

আর প্রাইভেট স্কুলে যে শিক্ষক ২-৩ বছর চাকরি করেছেন, এখন চাকরির ক্ষেত্র পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন তাকে কি সেই সুযোগটা দেয়া হয়? যদি আপনি আপনার অফিসে মার্কেটিংয়ের জন্য লোক নেন, তাহলে তার ২ বছরের শিক্ষকতা পেশাকে কি এক্সপেরিয়েন্স হিসাবে ধরবেন?

অথচ আপনার কোম্পানি যদি শিশুদের জন্য কোন প্রোডাক্ট তৈরি এবং বাজারজাত করে থাকে, তাহলে ওই শিক্ষক যত ভালোভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে শিশুদের মন জয় করার উপায়গুলো বলতে পারবেন, সেটি আর কেউ পারবে না। এভাবে কি কোনোদিন ভেবেছেন?

Steve Wozniak (Apple Co-founder), Hugh Jackman, Sylvester Stallone, Jimmy Carter (American President), J K Rowling, Dan Brown সহ জ্ঞানী-গুণী মানুষদের অনেকেই ছিলেন স্কুল শিক্ষক।

Teach For Bangladesh ২ বছর মেয়াদি একটি লিডারশীপ প্রোগ্রাম চালু রেখেছে, যেখানে নামি-দামি সব ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েটরা আবেদন করে। এই ২ বছরে ফেলোরা বিভিন্ন স্কুলে (বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত স্কুলে) শিশুদের ক্লাস নেয়, তাদের জীবনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। এই ২ বছরের প্রোগ্রাম শেষ করার পর অনেক প্রতিষ্ঠান সেই ফেলোদেরকে নিজ কোম্পানিতে চাকরি দিতে লাইন ধরে।

যেদিন দেশের সব কোম্পানি শিক্ষকতা পেশাকে গুরুত্ব দিতে শিখবে এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবে সেদিন থেকে শিক্ষকতা পেশাকে এই সমাজে আর ছোট করে দেখা হবেনা। বরং একটি দারুণ ক্যারিয়ার অপর্চুনিটি হিসেবে তরুণরা শিক্ষকতাকে বিবেচনা করবে, যা নিঃসন্দেহে দেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।

এই আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসে আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে কিছু জিনিস করতে পারি বা নিজের চিন্তাধারায় এমন কিছু পরিবর্তন আনতে পারি, যা গোটা জাতির কাছে শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানের সাথে তুলে ধরবে এবং পেশাটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া হতাশা ও অবমূল্যায়নকে দূর করবে। যেমনঃ

১। শিক্ষকতা পেশাকে কেবল ক্লাসে শিশুদের পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে লিডারশীপ রোলের সাথে তুলনা করতে শেখা।

২। শিক্ষকতা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম কাজগুলোর মধ্যে একটি – এটি বিশ্বাস করা। আপনার কোম্পানিতে কোথাও যদি এমন রোলের দরকার পরে যেখানে problem-solving, collaboration, hard-working, critical thinking ইত্যাদি গুণগুলোর প্রয়োজন পরে, তাহলে একজন শিক্ষককেও সেই রোলের জন্য চিন্তা করার মানসিকতা নিজের মধ্যে আনা।

৩। নিজ নিজ সন্তানের শিক্ষককে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া।

স্কুলে শিক্ষকতা পেশাটি নিয়ে যদি আপনি আজকে থেকেই না ভাবেন এবং নিজ অবস্থান থেকে কিছু না করেন, আপনার শিশুও ভবিষ্যতে ভুক্তভুগী হতে পারে সেটি মাথায় রাখবেন। দিন শেষে, আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ কিন্তু ওই ৮-১০ হাজার টাকা বেতনের শিক্ষকের হাতেই তৈরি হয়। 

Teachers Time থেকে আমরা তৈরি করেছি বিভিন্ন লাইভ এবং রেকর্ডেড কোর্স , যেগুলো করার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষকরা নিজেদের দক্ষতা আরও অনেকাংশে বাড়াতে সক্ষম হবেন।

শেষ করছি এই সুন্দর উক্তিটি দিয়ে , ”আমাদের মনে রাখতে হবে: একটি বই, একটি কলম, একটি শিশু এবং একজন শিক্ষক বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারে।” – মালালা ইউসুফজাই।

1 Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *